Sri Sri Nityananda Prabhu Appearance Day

 
শ্রীচৈতন্য লীলার ব্যাস শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর নিজ প্রভু শ্রীনিত্যানন্দকে বহু নামে অভিহিত করেছেন। শ্রীনিত্যানন্দ অবধূত, শ্রীনিত্যানন্দ চন্দ্র,নিত্যানন্দ প্রভু, নিত্যানন্দ মহামহেশ্বর, নিত্যানন্দ সিংহ, নিত্যানন্দ মহামল্ল, অবধূত চন্দ্র, অবধৃত রায় ও শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের প্রিয় বিগ্রহ ইত্যাদি।
 
শ্রীগৌরসুন্দর মহাবদান্য ; কিন্তু শ্রীনিত্যানন্দ যাঁকে আত্মসাৎ করেন নাই, শ্রীগৌরসুন্দর তাঁকে কখনই কৃপা করেন না। শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর বলেছেন
 
সংসারের পার হই, ভক্তির সাগরে।
যে ডুবিবে, সে ভজুক নিতাইচঁাদেরে।।
বৈষ্ণব-চরণে মোর এই মনস্কাম।
ভজি যেন জন্মে-জন্মে প্রভু বলরাম।।
 
-(চৈঃ ভাঃ আঃ১|77-78)
 
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু বলদেবাভিন্ন বিগ্রহ। শ্রীবৃন্দাবন দাস এভাবে নিজ ইষ্ট দেবের বন্দনা করেছেন –
 
ইষ্টদেব বন্দো মোর নিত্যানন্দ-রায়।
চৈতন্যের কীর্ত্তি ক্ষুরে যাঁহার কৃপায়।।
সহস্ৰবদন বন্দো প্রভু বলরাম।
যাঁহার সহস্র-মুখে কৃষ্ণযশোধাম।।
মহারত্ন থুই যেন মহাপ্রিয় স্থানে।
যশোরত্ন ভান্ডার শ্রীঅনন্ত বদনে।।
অতএব আগে বলরামের স্তবন।
করিলে সে মুখে স্ফুরে চৈতন্য কীৰ্ত্তন।।
সহস্রেক ফণাধর প্রভু বলরাম।
যতেক করয়ে প্রভু সকল-উদ্দাম।।
 
– (চৈঃ ভাঃ আদি ১।১১-১৫)
 
শ্রীমদ্ কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর স্বরূপ সম্বন্ধে শ্রীবৃন্দাবন দাসের শ্রীচরণানুস্মরণে এরূপ বর্ণনা করেছেন—
 
সর্ব্ব-অবতারী কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান।
তাঁহার দ্বিতীয় দেহ শ্রীবলরাম।।
একই স্বরূপ-দোঁহে, ভিন্ন মাত্র কায়৷
আদ্য কায়ব্যূহ কৃষ্ণলীলার সহায় ৷৷
সেই কৃষ্ণ—নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যচন্দ্ৰ।
সেই বলরাম—সঙ্গে শ্রীনিত্যানন্দ ৷৷
 
–(চৈঃ চঃ আদি ৫ |৪-৬)
 
এখন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর আবির্ভাব সম্বন্ধে শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর এরূপ বর্ণনা করেছেন—
 
ঈশ্বর আজ্ঞায় আগে শ্রীঅনন্ত-ধাম।
রাঢ়ে অবতীর্ণ হৈলা নিত্যানন্দ-রাম।।
মাঘ মাসে শুক্লা ত্রয়োদশী শুভদিনে।
পদ্মাবতী গর্ভে একচাকা-নাম গ্রামে।।
হাড়াইপণ্ডিত নামে শুদ্ধ বিপ্ররাজ।
মুলে সৰ্ব্বপিতা তানে করে পিতা ব্যাজ।।
(চৈঃ ভাঃ আদি ২।১২৮-১ ৩০)
 
রাঢ় দেশ, বদ্ধমান জেলার অন্তর্গত। একচাকা গ্রাম রাঢ় পরগণার মধ্যে। ই, আই, আর লুপ লাইনে মল্লারপুর ষ্টেশন হ’তে প্রায় চারি ক্রোশ পূর্ব্ব দিকে একচাকা গ্রাম, বর্ত্তমান ঐ গ্রামের নাম শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর পুত্র বীরচন্দ্রের নামে বীরচন্দ্রপুর নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে।
 
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু একচাকা গ্রামে অবতীর্ণ হন। পিতার নাম শ্রীহাড়াই পণ্ডিত বা শ্রীহাড়ো ওঝা। ইনি মৈথিল ব্রাহ্মণ ছিলেন, উপাধ্যায় কৌলিক উপাধির অপভ্রংশই ওঝা বা ঝা। মাতার নাম শ্রীপদ্মাবতী দেবী। ব্রাহ্মণ দম্পতি নিত্য ভগবদ্ আরাধনার ও বৈষ্ণব সেবার ফলে, আদি বৈষ্ণব ধাম শ্রীঅনন্ত স্বয়ং পুত্ররূপে অবতীর্ণ হন।
 
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর আবির্ভাবে সমস্ত রাঢ় দেশে সৰ্ব্ব সুমঙ্গল অভ্যুদয় লক্ষিত হয়েছিল। দ্বাপর যুগে যেমন শ্রীবলদেব শ্রীকৃষ্ণের অগ্রজ রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তেমনি কলিযুগে শ্রীনিত্যানন্দ শ্রীগৌরসুন্দরের বড় ভ্রাতা রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যখন শ্রীগৌরসুন্দর নবদ্বীপ মায়াপুরে তের বৎসর পরে আবির্ভূত হলেন, তখন অন্তর্যামী নিত্যানন্দ প্রভু তার আবির্ভাব জানতে পেরে আনন্দে মহা হুঙ্কার ধ্বনি করে উঠলেন। ঐ হুঙ্কার ধ্বনি শুনে দেশবাসী জনসাধারণ নানাপ্রকার মত প্রকাশ করেছিলেন। কেহ বললেন বজ্রপাত হয়েছে, কেহ বললেন রাঢ় দেশে মৌড়েশ্বর নামক যে শিব আছেন তিনি হুঙ্কার করে উঠেছেন, কেহ বললেন ভগবান্ গৰ্জ্জন করেছেন, এরূপ অনেক লোক অনেক রূপ কথা বললেন।
 
শ্রীবৃন্দাবন দাস তাঁর ইষ্টদেব শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর জন্ম লীলা, শৈশব লীলা, পৌগন্ড লীলা, কৈশোর লীলা ও যৌবন লীলাদি দিব্যাতি দিব্য লোকাতীত অলৌকিক স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। শ্রীগৌরসুন্দরের যাবতীয় লীলা লৌকিক ভাবের মধ্যে ঈশ্বরীয় ভাবের কথা বলেছেন। এরূপে দুই প্রভুর লীলার মাধুর্য্য তিনি আস্বাদন করেছেন।
 
শ্রীনিত্যানন্দের শৈশব লীলা অলৌকিক দিব্য ভাবাবেশে শ্রীরামচন্দ্রের ও শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রের মধুর বাল্য লীলাদির অভিনয়ের কথা বর্ণনা করেছেন। জগৎ মধ্যবর্ত্তী শিশুগণের যে ধর্ম– ভোজনার্থে বার বার ক্রন্দন চাঞ্চলতা ভয় ভীতি স্বভাব ও বস্তুর অপচয় প্রভৃতি ধর্মের কথা নিত্যানন্দ চরিতে বলেন নাই, কিন্তু শ্রীগৌরসুন্দরের চরিতে বিশেষ ভাবে বলেছেন।
 
শ্রীবৃন্দাবন দাস নিত্যানন্দের অলৌকিক শৈশব লীলা এরূপ বর্ণনা করেছেন —
 
 
শিশুগণ সঙ্গে প্রভু যত ক্রীড়া করে।
শ্রীকৃষ্ণের কার্য্য বিনা আর নাহি স্ফুরে।।
দেব-সভা করেন মিলিয়া শিশুগণে।
পৃথিবীর রূপে কেহ করে নিবেদনে।।
তবে পৃথ্বী লৈয়া সবে নদী তীরে যায়।
শিশুগণ মেলি’ স্তুতি করে ঊর্দ্ধ রায়।।
কোন শিশু লুকাইয়া ঊর্দ্ধ করি’ বোলে।
জন্মিবাঙ্ গিয়া আমি মথুরা-গোকুলে।।
কোনদিন নিশাভাগে শিশুগণ লৈয়া।
বসুদেব দেবকীর করায়েন বিয়া।।
বন্দিঘর করিয়া অত্যন্ত নিশাভাগে।
কৃষ্ণ-জন্ম করায়েন কেহ নাহি জাগে।।
গোকুল সৃজিয়া তথি আনেন কৃষ্ণেরে।
মহামায়া দিলা লৈয়া ভান্ডিলা কংসেরে।।
কোন শিশু সাজায়েন পূতনার রূপে।
কেহ স্তন পান করে উঠি’ তার বুকে।।
 
ইত্যাদি।। আবার রামলীলা অভিনয় করছেন –
 
কোনদিন নিত্যানন্দ সেতুবন্ধ করে।
বানরের রূপ সব শিশুগণ ধরে।।
ভেরেন্ডার গাছ কাটি ফেলায়েন জলে।
শিশুগণ মিলি জয় রঘুনাথ, বলে।।
শ্রীলক্ষ্মণ রূপ প্রভু ধরিয়া আপনে।
ধনু ধরি কোপে চলে সুগ্রীবের স্থানে।।
আরেরে বানরা মোর প্রভু দুঃখ পায়।
প্রাণ না লইমু যদি তবে ঝাট আয়।।
মাল্যবান্ পর্ব্বতে মোর প্রভু পায় দুঃখ।
নারীগণ লৈয়া বেটা তুমি কর সুখ।।
কোনদিন ক্রুদ্ধ হৈয়া পরশুরামেরে।
মোর দোষ নাহি বিপ্র পলাহ সত্ত্বরে।।
লক্ষ্মণের ভাবে প্রভু হয় সেইরূপ।
বুঝিতে না পারে শিশু মানয়ে কৌতুক।।
 
ইন্দ্রজিৎ বধ লীলা কোনদিন করে।
কোনদিন আপনে লক্ষ্মণ ভাবে হারে।।
বিভীষণ করিয়া আনেন রাম স্থানে।
লঙ্কেশ্বর অভিষেক করেন তাহানে।।
কোন শিশু বোলে, মুঞি আইলু রাবণ।
শক্তি শেল হানি এহ সম্বর লক্ষণ।।
এত বলি পদ্ম পুষ্প মারিল ফেলিয়া।
লক্ষ্মণের ভাবে প্রভু পড়িলা ঢলিয়া।।
 
― (চৈঃ ভাঃ আদি নবম অধ্যায়)
 
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এভাবে যখন মূৰ্চ্ছা গেলেন তখন সঙ্গের শিশুগণ তাকে জাগানোর চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু যেন তিনি প্রাণ শূন্য ভাবে পড়ে রইলেন, তা দেখে শিশুগণ এবার ভীত হয়ে শীঘ্র তথায় ছুটে এলেন দেখলেন সত্য সত্যই যেন প্রাণশূন্য নিত্যানন্দ। কেহ বললেন শিশু ভাবাবিষ্ট হয়েছে, কেহ বললেন অভিনয় করছে, হনুমান ঔষধ দিলে ভাল হবে। তখন কোন শিশু হনুমানের ভাবে শীঘ্র ঔষধ নিয়ে এলেন। এক শিশু বৈদ্য বেশে সেই আনীত বৃক্ষলতার রস নিঙ্গড়াইয়া নিত্যানন্দের নাসাতে দিলেন। তৎক্ষণাৎ নিত্যানন্দ প্রভু চৈতন্য লাভ করে উঠে বসলেন, সকলে অবাক হয়ে গেলেন, বললেন আমরা কখন এরূপ খেলা দেখিনি। সকলে তখন জিজ্ঞাসা করলেন তুমি এরূপ খেলা কোথায় শিখলে। নিত্যানন্দ বললেন –আমার এ সকল লীলা অর্থাৎ স্বতঃসিদ্ধ লীলা। কেহই কিন্তু নিত্যানন্দের যথার্থ স্বরূপ জানতে পারলেন না। “চিনিতে না পারে কেহ বিষ্ণুমায়াবশে” এরূপ ভাবে নিত্যানন্দ প্রভু শৈশব ও পৌগন্ড অতিক্রম করে কৈশোর বয়সে পদার্পণ করলেন। তখন তার বয়স বার বৎসর।
 
শ্রীনিত্যানন্দ শ্রীহাড়াই ও পদ্মাবতীর একমাত্র নয়নমণি ও প্রাণ ছিলেন। মাতা পিতা নিত্যানন্দকে একক্ষণ না দেখলে থাকতে পারতেন না। হাড়াই পণ্ডিত সবিধ কার্য্যের মধ্যে থাকলেও প্রাণটি নিত্যানন্দের প্রতি পড়ে থাকত।
 
একদিন এক বৈষ্ণব সন্ন্যাসী হাড়াই পণ্ডিতের ঘরে অতিথি হলেন। হাড়াই পণ্ডিত সন্ন্যাসীকে খুব যত্নে সেবা করতে লাগলেন। রাত্রিকালেও সন্ন্যাসী হাড়াই পণ্ডিতের ঘরে অবস্থান করলেন। নিত্যানন্দ প্রভু সন্ন্যাসীকে পেয়ে আনন্দে বিভোর হলেন। সমস্ত রাত্রি সন্ন্যাসীর সঙ্গে কৃষ্ণ কথায় যাপন করলেন। নিত্যানন্দের সর্বাকর্ষণ স্বভাবে সন্ন্যাসী পরমাকৃষ্ট হলেন। নিত্যানন্দের সঙ্গ ত্যাগ করতে আর ইচ্ছা করলেন না। প্রাতঃকালে সন্ন্যাসী বিদায় নিতে উন্মুখ হয়ে মনের গূঢ় অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীর কাছে নিত্যানন্দকে ভিক্ষা চাইলেন। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী সন্ন্যাসীর কথা শুনে বিনা মেঘে বজ্রপাতের ন্যায় যেন মূৰ্চ্ছা প্রাপ্ত হলেন, কি নিদারুণ কথা, একমাত্র প্রাণের প্রাণস্বরূপ পুত্র নিত্যানন্দকে ভিক্ষা দিতে হবে। পরিশেষে ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণী ধৈর্য্য ধারণ পূর্ব্বক বিচার করলেন, পূর্ব্বাকালে মহারাজ দশরথ যেমন বিশ্বামিত্রের হাতে রাম লক্ষ্মণকে ভিক্ষা দিয়েছিলেন, সেইরূপ আজ এ সন্ন্যাসীর হাতে নিত্যানন্দকে সমর্পণ করব, নতুবা আমাদের পরম অধর্ম হবে। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী ক্রন্দন করতে করতে নিত্যানন্দকে অর্পণ করলেন। অতীব অনুনয়ের সংগে বললেন আমাদের একমাত্র প্রাণটিকে আপনাকে দিলাম। আপনি সৰ্ব্বতোভাবে এঁকে রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। সন্ন্যাসীর সংগে শ্রীনিত্যানন্দ তীর্থ ভ্রমণে চললেন। শ্রীচৈতন্য ভাগবতে আদি খণ্ডের নবম অধ্যায়ে নিত্যানন্দের তীর্থ ভ্রমণ কথাটি বিস্তৃত ভাবে আছে।
 
পশ্চিম ভারতে ভ্রমণ কালে নিত্যানন্দ প্রভুর সংগে অকস্মাৎ শ্রীমাধবেন্দ্র পুরীর সাক্ষাৎকার হয়। উভয়ের দর্শনে উভয়ের হৃদয়ে প্রেম সমুদ্র যেন উথলে উঠল। উভয়ের অপূর্ব্ব প্রেমাবেশ দর্শনে ঈশ্বর পুরী প্রভৃতি শিষ্যগণ বিস্মিত হলেন। নিত্যানন্দপ্রভুকে পেয়ে শ্রীমাধবেন্দ্র পুরীপাদ আনন্দে এরূপ বলেছিলেন।
 
প্রেম না দেখিলুঁ কোথা।
সেই মোর সর্ব্ব তীর্থ, হেন প্রেম যথা।।
জানিলু কৃষ্ণের কৃপা আছে মোর প্রতি।
নিত্যানন্দ হেন বন্ধু পাইনু সংহতি।।
যে সে স্থানে যদি নিত্যানন্দ সঙ্গ হয়।
সেই স্থান সৰ্ব্বতীর্থ বৈকুণ্ঠাদি-ময়৷৷
নিত্যানন্দ হেন ভক্ত শুনিলে শ্রবণে।
অবশ্য পাইবে কৃষ্ণচন্দ্র সেই জনে।।
 
(চৈঃ ভাঃ আদিঃ ৯।১৮২-১৮৫)
 
কিছুদিন নিত্যানন্দ প্রভু শ্রীমাধবেন্দ্র পুরীর সঙ্গে পরম সুখে কৃষ্ণালাপনে অতিবাহিত করলেন। অনন্তর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু সেতুবন্ধাদি তীর্থ দর্শনে চললেন। ক্রমে তিনি ধনুস্তীর্থ, বিজয় নগর, অবস্তি দেশ ও গোদাবরী প্রভৃতি দর্শন করে পুরী ধামে এলেন। শ্রীজগন্নাথ দর্শনে অতীব প্রেমাবিষ্ট হয়ে নৃত্য গীতাদি করলেন। কয়েক দিবস তথায় অবস্থানের পর তিনি গঙ্গাসাগর তীর্থে আগমন করলেন। এখান হতে শ্রীব্রজমন্ডলে আগমন করলেন। শ্রীব্রজ ধামে আগমনে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এক অপূৰ্ব্ব প্রেমাবস্থা প্রাপ্ত হলেন।
 
নিরবধি বৃন্দাবনে করেন বসতি।
কৃষ্ণের আবেশে না জানেন দিবা-রাতি।।
আহার নাহিক, কদাচিৎ দুগ্ধ পান।
সেহ যদি অযাচিত কেহ করে দান।।
– (চৈঃ ভাঃ আদি ৯।২০৫ ২০৬)
 
যখন বৃন্দাবনে শ্রীনিত্যানন্দ এরূপ ভাবাবেশে অবস্থান করছিলেন তখন এদিকে শ্রীগৌরসুন্দর বিদ্যা বিলাসাদি সমাপ্ত করে গয়া ধামে পিতৃ কর্ম সমাপনানস্তর শ্রীঈশ্বর পুরীকে তথায় পেয়ে তাঁর কাছ থেকে মন্ত্র দীক্ষা গ্রহণ করলেন। এবার ভাগবত ধর্ম প্রচারের জন্য ও জীব কুলের উদ্ধারের জন্য তিনি আত্মপ্রকাশ করলেন এবং নিরন্তর ভক্তগণ সঙ্গে প্রেম রসাস্বাদন করতে লাগলেন। শ্রীবাস পণ্ডিতের ভবন হল তার সংকীৰ্ত্তন সদন।
 
তিনি ভক্তগণ সঙ্গে প্রেমারসাস্বাদন করছেন। কিন্তু সাধারণ অন্য কোন জীবকে দিচ্ছেন না, যেন কারও প্রতীক্ষায় তিনি আছেন। কে জানে, তাঁর সেই গূঢ় অভিপ্রায়। নিত্যানন্দ হবেন প্রেমধন বিতরণের প্রধান সহায়ক, তাই যেন গৌরসুন্দর তার প্রতীক্ষা করছেন।
 
এদিকে বৃন্দাবনে নিত্যানন্দ প্রভু কৃষ্ণপ্রেমাবেশে কৃষ্ণানুসন্ধান করছেন, সব মন্দিরে সিংহাসন যেন শূন্য, কৃষ্ণ নাই; কোথায় কৃষ্ণ ! কোথায় কৃষ্ণ ! বলে সর্ব্বত্র অনুসন্ধান করতে করতে যেন শেষে দৈব বাণীতে শুনলেন — তিনি এখন নদীয়াতে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং সংকীর্ত্তন বিলাস করছেন। তুমি তথায় যাও। একথা শুনে নিত্যানন্দ চললেন ব্রজমন্ডল থেকে গৌড় মন্ডল অভিমুখে। কোনদিন অযাচিত ভাবে কোথায় একটু দুগ্ধ পান নহেত উপবাস। এভাবে শীঘ্রই গৌড়দেশে নবদ্বীপে আগমন করলেন। নবদ্বীপে মায়াপুরে শ্রীনন্দন আচার্য্য নামক এক পরম মহাভাগবত বাস করতেন গঙ্গাতটে, অকস্মাং শ্রীনিত্যানন্দ তাঁর গৃহে উপস্থিত হলেন। শ্রীনন্দন আচাৰ্য্য আজানুলম্বিত সেই পুরুষ রতনকে দর্শন করে ভক্তি ভরে দন্ডবন্নতি পূর্ব্বক পূজাদি করলেন এবং ভিক্ষা করিয়ে গৃহেতে রাখলেন।
 
এদিকে অন্তর্যামী শ্রীগৌরসুন্দর তা জানতে পেরে অন্তরে অন্তরে শীঘ্রই তাঁর সঙ্গে মিলিত হবার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং সত্বর প্রাতেঃ শ্রীবাস অঙ্গনে আগমন করলেন। ক্রমে ভক্তগণ আগমন করতে লাগলেন। সকলেই প্রভুর চারিদিকে উপবেশন করলেন, এমন সময় মহাপ্রভু ভঙ্গিপূৰ্ব্বক বলতে লাগলেন—আমি আজ শেষ রাত্রে এক সুস্বপ্ন দেখেছি, শেষ রজনীর স্বপ্ন প্রায় মিথ্যা হয় না। সে কথা শুনে ভক্তগণ অপূৰ্ব্ব স্বপ্ন কথা শুনতে উৎসুক হলেন। তখন মহাপ্রভু বলতে লাগলেন – এক তালধ্বজ রথ যেন আমার গৃহ দ্বারে উপনীত হল, সে রথের মধ্যে এক বিশালকায় মহাপুরুষ শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তার স্কন্ধে হল ও মূষল আছে। তিনি নীল বসন পরিহিত তার বাম হাতে বেত্র নির্মিত কমন্ডলু। তিনি পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করছেন—এ বাড়ী কি নিমাই পণ্ডিতের? এ বাড়ী কি নিমাই পণ্ডিতের? আমি তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন আমি তোমার ভাই। আগামী কল্য পরস্পর পরিচয় হবে। তার কথা শুনে আমার বড়ই আনন্দ হল, স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল, নিশা শেষ হল। এ কথা বলতে বলতে মহাপ্রভু এক দিব্য ভাবে বিভোর হলেন। কিছুক্ষণ ভাবাবিষ্ট থাকার পর বাহ্য দশা প্রাপ্ত হলেন এবং হরিদাস ঠাকুর শ্রীবাস পণ্ডিত প্রভৃতির স্থানে বলতে লাগলেন আমার মনে হয় এ নবদ্বীপ পুরে নিশ্চয় কোন মহাপুরুষ আগমন করেছেন আপনারা তাঁকে অনুসন্ধান করুন। প্রভুর এ আজ্ঞা পেয়ে ভক্তগণ স্বপ্ন দৃষ্ট পুরুষের সন্ধানে বের হলেন এবং চতুর্দিকে সন্ধান করতে লাগলেন। কিন্তু কোথাও সন্ধান পেলেন না, ফিরে এলেন প্রভুর কাছে। প্রভু বললেন স্বপ্ন কথা মিথ্যা নয় নিশ্চয়ই কোন স্থানে আছে, এবার প্রভু স্বয়ং অনুসন্ধান করতে চললেন। ভক্তগণও পশ্চাৎ পশ্চাৎ চললেন। মহাপ্রভু সোজাসুজি ঠিক শ্রীনন্দন আচার্য্যের গৃহে উপস্থিত হলেন। দেখলেন শ্রীনন্দন আচার্য্যের গৃহ-বারান্দায় দিব্য আসনে এক মহাপুরুষ রতন ধ্যানাবিষ্ট ভাবে উপবিষ্ট আছেন। সকলে অবাক মহাপ্রভু বহুকাল পরে প্রাণের প্রিয়তম জনকে দর্শন করে কিছুক্ষণ অপলক নয়নে দাঁড়িয়ে রইলেন, শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুও প্রাণের দেবতাকে দীর্ঘকাল পরে দেখে পলকশূন্য ভাবে দেখতে লাগলেন কি আশ্চর্য্য মিলন নয়নে নয়নে যেন দুহুে দুার রূপ পানে বিভোর। এমন সময় শ্রীবাস পণ্ডিত ভাগবতের একটি শ্রীকৃষ্ণের রূপ বর্ণনাত্মক শ্লোক সুস্বরে গান আরম্ভ করলেন। তা শুনে শ্রীনিত্যানন্দ প্রেমে হুঙ্কার পূর্ব্বক ধরাতলে গড়াগড়ি দিতে লাগলেন ; তার নয়ন জলে ভূতল সিক্ত হতে লাগল। সেই প্রেম দর্শনে শ্রীগৌরসুন্দর আর স্থির থাকতে পারলেন না; তিনিও কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে প্রেমাশ্রুপাত করতে করতে নিত্যানন্দকে জড়িয়ে ধরলেন এবং কোলে তুলে নিলেন। সে কি মধুর মিলন দৃশ্য, দুঁহার নয়ন জলে দুই জন সিক্ত হচ্ছেন ভক্তগণ তৎকালে ঘন ঘন হরি ধ্বনি করতে লাগলেন। আজ শ্রীগৌর নিত্যানন্দের মিলন হল।
 
তারপর মহাপ্রভু শ্রীনিত্যানন্দকে নিয়ে ভক্তগণ সঙ্গে মহানন্দে শ্রীবাস অঙ্গনে আগমন করলেন এবং কিছুক্ষণ নৃত্যকীর্ত্তন করবার পর মহাপ্রভু নির্দেশ দিলেন শ্রীনিত্যানন্দ শ্রীবাস স্থানে অবস্থান করবেন।
 
শ্রীবাস পণ্ডিত প্রভুর আজ্ঞায় নিত্যানন্দকে সাক্ষাৎ ঈশ্বর জ্ঞানে সেবা করতে লাগলেন। শ্রীবাসের মালিনী দেবীকে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু জননীর ন্যায় ভাবতেন। মালিনী দেবীও নিত্যানন্দ প্রভুকে পুত্র প্রায় সেবা করতেন। একদিন এক অপুর্ব্ব ঘটনা হল। মালিনী দেবী ভগবদ্ অর্জুনের বাসন সমূহ মাৰ্জ্জন করছেন এমন সময় এক কাক উড়ে এসে ঠাকুরের ঘৃত বাটীটি নিয়ে গেল। মালিনী দেবী হায় হায় করে উঠলেন এবং অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলেন। সে দুঃখ শ্রবণে নিত্যানন্দ প্রভু তৎক্ষণাৎ তথায় উপস্থিত হলেন এবং সমস্ত কারণ অবগত হলেন। তখন মালিনী দেবীকে বললেন মা! তুমি দুঃখ করনা আমি এক্ষণে ঐ বাটী এনে দেব এ কথা বলে তিনি কাককে আহ্বান করে বললেন রে কাক তুই শীঘ্র করে ঠাকুরের ঘৃত বাটীটি এনে দে। নিত্যানন্দ-আদেশে কাকটি শীঘ্রই ঘৃত বাটীটি কোথা হতে এনে দিয়ে উড়ে গেল, সকলে দেখে অবাক। যে নিত্যানন্দ প্রভু ত্রিলোকের অধীশ্বর তার পক্ষে অসম্ভব কি?
 
একদিন শ্রীগৌরসুন্দর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকে জিজ্ঞাসা করলেন হে শ্রীপাদ ! কাল পূর্ণিমা তিথি ব্যাসপূজা দিবস। তুমি কোথায় শ্রীব্যাস পূজা করবে? তখন নিত্যানন্দ প্রভু শ্রীবাস পণ্ডিতের হাত ধরে বললেন, এ বামনের ঘরে। শ্রীবাস পণ্ডিত ব্যাস পূজা মহোৎসবের সব আয়োজন করলেন। অধিবাস দিবসে সুসজ্জিত ব্যাস পূজা মন্ডপে প্রাতঃকাল থেকেই কীৰ্ত্তন আরম্ভ হল। নিয়ম করা হল ভক্ত ব্যতীত অঙ্গনে অন্য কোন লোক প্রবেশ করতে পারবে না। আরম্ভ হল গৌর নিত্যানন্দ দুই ভাইয়ের মহানৃত্য সংকীৰ্ত্তন। আজ গোলোকের হরি ভূলোকে নেমেছেন যুগধর্ম নাম সংকীৰ্ত্তন এবং স্বীয় ভক্তিরস মাধুর্য্য আস্বাদনের জন্য। মধ্যাহ কালে বিশ্রাম করলেন, পুনঃ সন্ধ্যাকাল হতে মহাসঙ্কীর্ত্তন আরম্ভ হল প্রায় মধ্য রাত্র পর্য্যন্ত নৃত্য সংকীৰ্ত্তন চলল। ভক্তগণ নিজ নিজ ভবনে চলে গেলেন মহাপ্রভু নিজ ভবনে এলেন নিত্যানন্দ প্রভু শ্রীবাস অঙ্গনে আছেন। কিছুরাত্র পরে শ্রীনিত্যানন্দ মহাভাবাবেশে হুঙ্কার করে উঠলেন এবং নিজ দন্ডটি ভেঙ্গে ফেললেন ও কমন্ডলুটি দুরে ফেললেন। পরদিবস প্রাতেঃ সৰ্ব্বান্তর্যামী প্রভু শীঘ্র শ্রীবাস অঙ্গনে এলেন এবং শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মহাভাবাবেশের কথা শ্রবণ করলেন, তখন তিনি সেই ভাঙ্গা দন্ডটি ও কমন্ডলু নিয়ে গঙ্গামধ্যে বিসর্জ্জন করলেন। মহাপ্রভু ভক্তগণের কাছে জানালেন শ্রীনিত্যানন্দ মহাভাগবত নিত্যসিদ্ধ জন তার পক্ষে ত্রিগুণাত্মক বেদের নির্মিত বর্ণাশ্রম চিহ্নাদি রক্ষা করবার কোন প্রয়োজন নাই। নিত্যানন্দের সঙ্গে মহাপ্রভু গঙ্গা স্নানাদি করে শ্রীবাস অঙ্গনে ফিরে এলেন। শ্রীবাস পণ্ডিত দুই প্রভুকে নব বস্ত্রাদি পরিধান করতে দিলেন। আজ ব্যাস পূজা দিবস ভক্তগণ মহা সংকীর্ত্তন আরম্ভ করলেন, সঙ্গে সঙ্গে মৃদঙ্গ মধুর বাদন হ’তে লাগল। শ্রীবাস অঙ্গনে যেন স্বয়ং আনন্দ মূর্তিমান অবতীর্ণ হয়েছেন, গগন, পবন, দ্যুলোক, ভুলোক ও গোলোক সেই আনন্দ সিন্ধুর হিল্লোলে নৃত্য করছে। সকলেই সুখসিন্ধু সাগরে ডুবে গেছেন ৷
 
এদিকে শ্রীবাস পণ্ডিত প্রভুর ইঙ্গিতে একটি দিব্য সুগন্ধি মালা শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর হাতে দিলেন। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু সে মালাটি হাতে নিয়ে আনন্দে বিভোর চিত্তে চারিদিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগলেন। তারপর মহাপ্রভু বললেন শ্রীপাদ মালাটি ব্যাসের কন্ঠে দিয়ে ব্যাস পূজা সুসম্পন্ন করুন। প্রভুর কথা শুনে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু হাস্য করতে করতে মালাটি শ্রীগৌরসুন্দরের কন্ঠে পরিয়ে দিলেন, তখন চতুর্দিকে ভক্তগণ মহা হরিধ্বনি করে উঠলেন। আকাশ থেকে দেবগণ ও দেবীগণ আনন্দে নৃত্য গীত সহ যেন পুষ্প বৃষ্টি করতে লাগলেন। এবার শ্রীগৌরসুন্দর নিত্যানন্দ প্রভুকে ষড়ভুক্ত দর্শন করালেন। নিত্যানন্দ প্রভু সে দিব্য স্বরূপ দর্শনে আনন্দে প্রেম মূৰ্চ্ছা গেলেন। তখন শ্রীগৌরসুন্দর শ্রীনিত্যানন্দের শ্রীঅঙ্গ স্পর্শ করে বললেন, শ্রীপাদ তুমি স্থির হও, যে সংকীর্ত্তন প্রচারের জন্য তুমি অবতীর্ণ হয়েছতা সিদ্ধ হল। তুমি প্রেমভক্তি ধনের ভাড়ারী; তাহতে তুমি যদি লোককে কিছু দাও তবেই তারা প্রেম লাভ করতে পারে। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু বাহ্য দশা লাভ করে প্রেমে ক্রন্দন করতে লাগলেন। তখন মহাপ্রভু সকলকে বললেন— আজ ব্যাস পূজা পূর্ণ হল; তোমরা সকলে হরি কীর্ত্তন কর। একথা বলে দুই ভাই নৃত্য করতে লাগলেন, চারিদিকে ভক্তগণ কীর্ত্তন করতে লাগলেন। মালিনীদেবীর সঙ্গে শ্রীশচী মাতা নিভৃতে বসে এ সকল লীলা দর্শন করতে লাগলেন। সংকীৰ্ত্তন অন্তে শ্রীব্যাস পূজার প্রসাদ শ্রীবাস পণ্ডিত সমস্ত ভক্তগণকে বিতরণ করলেন।
 
শ্রীব্যাস পূজার পর একদিন শ্রীগৌরসুন্দর শ্রীবাস পণ্ডিতের ভ্রাতা শ্রীরাম পণ্ডিতকে শান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈত আচার্য্যের নিকট প্রেরণ করলেন। শ্রীরাম পণ্ডিত অদ্বৈত আচার্য্য ভবনে এলেন এবং নিত্যানন্দের আগমন বার্তা বললেন। শ্ৰীঅদ্বৈত আচাৰ্য্য শীঘ্রই শ্রীগৌরসুন্দর ও নিত্যানন্দের শ্রীচরণ দর্শনে চললেন। শ্রীগৌরসুন্দর অদ্বৈত আচার্য্যের মনোগত যেসব সঙ্কল্প তা বলতে লাগলেন। তচ্ছু বণে আনন্দে শ্রীগৌর-পাদপদ্ম-যুগল মহার্চ্চন করলেন। অনন্তর মহাপ্রভু ভগবদ্ মন্দিরে প্রবেশ পূর্ব্বক বিষ্ণু খট্টায় উপবেশন করলেন; নিত্যানন্দ প্রভু শিরে ছত্র ধারণ করলেন, অদ্বৈত প্রভু স্তুতি পাঠ করতে লাগলেন, গদাধর পণ্ডিত তাম্বুল প্রদান ও শ্রীবাস চামর ব্যজন প্রভৃতি এরূপ ভাবে প্রত্যেক ভক্ত কিছু না কিছু প্রভুর সেবা করতে লাগলেন ৷
 
একদিন মহাপ্রভু শ্রীবাস পণ্ডিতকে নিত্যানন্দ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন, শ্রীবাস পণ্ডিত বললেন শ্রীনিত্যানন্দ তোমারই দেহ; তোমাদের উভয়ের মধ্যে কোন ভেদ আমি দেখি না বরং তোমাকে জানতে হলে নিতাইয়ের কৃপা সাপেক্ষ। গৌরসুন্দর শ্রীবাসের মুখে একথা শুনে আনন্দে বললেন শ্রীবাস নিত্যানন্দের প্রতি তোমার এতাদৃশ বিশ্বাস, আমি তোমাকে বর দান করছি। তোমার গৃহে কোনদিন অন্ন বস্ত্রের অভাব হবে না। তোমার গৃহে সকলেই আমার প্রিয় হবে।
 
আর একদিন শ্রীশচীমাতা এক অপূর্ব্ব স্বপ্ন দর্শন করলেন— গৌর নিতাই সাক্ষাৎ ব্রজের কানাই বলাই। নিতাই শচীমাতাকে মা বলে আহ্বান করছেন, শচী মাতা রন্ধন করে নিতাইকে ভোজন করাচ্ছেন। প্রাতে এ শুভ স্বপ্ন কথা শচীমাতা শ্রীগৌর সুন্দরকে জানালেন, প্রভু বললেন জননী ! তবে আজ নিত্যানন্দকে আমন্ত্রণ করে আমাদের ঘরে ভোজন করান হউক, শচীমাতা নিতাইকে আমন্ত্রণ করতে আদেশ দিলেন।
 
শ্রীগৌরসুন্দর নিতাইকে আমন্ত্রণ করে ঘরে আনলেন, ভৃত্য ঈশান প্রভুদ্বয়ের পাদ ধৌত করে দিলেন। তারপর শচীমাতা নিমাই নিতাইকে ভোজনে বসালেন, দুই ভাই আনন্দে ভোজন করছেন, তখন শচীমাতা দেখছেন গৌর নিতাই ব্রজের কানাই বলাই রূপে যেন ভোজন করছেন। কিন্তু এ রহস্য শচীমাতা আর কাকেও বললেন না।
 
অন্যদিবস মহাপ্রভু শ্রীবাস অঙ্গনে ভক্তগণ সমীপে নিত্যানন্দ তত্ত্ব বলতে লাগলেন—নিত্যানন্দ আমার প্রকাশ বিগ্রহ স্বরূপ আমা হতে কিছুমাত্র ভেদ নাই। আমি নিত্যানন্দ দ্বারা বিশ্বে প্রেম ভক্তি দান করব। এ বলে মহাপ্রভু স্বহস্তে নিত্যানন্দের অঙ্গে গন্ধ লেপন ও কন্ঠে মাল্য প্রদানাদি পূৰ্ব্বক স্তুতি করতে লাগলেন। পরিশেষে এক খন্ড কৌপীন চেয়ে নিয়ে উহা খন্ড খন্ড পূর্ব্বক ভক্তগণের হস্তে প্রদান করলেন এবং মস্তকে বন্ধন করতে আদেশ করলেন। তখনই ভক্তগণ সানন্দে হরিধ্বনি করতে করতে মস্তকে বন্ধন করলেন। তারপর প্রভুর আদেশে ভক্তগণ সকলে নিত্যানন্দের চরণামৃত পান করলেন।
 
একদিন অকস্মাৎ শ্রীগৌরসুন্দর শ্রীনিত্যানন্দ ও শ্রীহরিদাস ঠাকুরকে আহ্বান পূর্বক বলতে লাগলেন- হে নিত্যানন্দ, হে হরিদাস তোমরা আমার আদেশ শ্রবণ কর। উভয়ে বললেন হে দয়াময় ! কি আদেশ আমাদের প্রতি কৃপা করে বলুন। প্রভু বললেন আদেশ এই – তোমরা প্রতি ঘরে ঘরে যাও এবং এই ভিক্ষা কর –– কি ভিক্ষা –– বল কৃষ্ণ ভজ কৃষ্ণ কর কৃষ্ণ শিক্ষা। মুখে কৃষ্ণ নাম কর, কৃষ্ণের চরণ আরাধনা কর ও ভক্তি সদাচার পালন কর। এ সমস্ত শিক্ষা ছাড়া অন্য কোন শিক্ষার কথা বলবে না। এটাই ভিক্ষা অন্য কোন ভিক্ষা নাই।
 
এস্থলে শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর সুন্দর বর্ণনা করেছেন—
 
শুন শুন নিত্যানন্দ, শুন হরিদাস।
সর্বত্র আমার আজ্ঞা করহ প্রকাশ।।
প্রতি ঘরে ঘরে গিয়া কর এই ভিক্ষা।
‘বল কৃষ্ণ, ভজ কৃষ্ণ, কর কৃষ্ণ শিক্ষা।।’
ইহা বই আর না বলিবা বলাইবা।
দিন অবসানে আসি, আমারে কহিবা।।
 
― (চৈঃ ভাঃ মধ্যঃ ১৩।৮।১০)
 
প্রভুর নির্দ্দেশ মত শ্রীনিত্যানন্দ ও শ্রীহরিদাস নদীয়া নগরের ঘরে ঘরে এরূপ ভাবে নাম প্রচার করতে লাগলেন। অনেক লোক নানা প্রকার কটাক্ষ ও কুৎসা করতে লাগলেন। আবার অনেক সজ্জন ব্যক্তি তাঁরা এ প্রচারটি উত্তম বলে প্রশংসা করতে লাগলেন। সে সময় নদীয়ার কোতয়ালের কার্য্য করত জগাই মাধাই। তারা ভয়ঙ্কর পাপী মদ্য পানে সর্বদা বিভোর থাকত ব্রাহ্মণ কুলে জন্ম তাদের। একদিন গঙ্গা তটে দুই মহাপাপী মদ্যপানে বিভোর হয়ে পড়ে আছে দয়াল ঠাঁকুর নিত্যানন্দ মনে মনে বিচার করলেন এ
দুই জনকে অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে। নিত্যানন্দ তাদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন এবং প্রভুর নিৰ্দ্দেশ জ্ঞাপন করলেন “বল কৃষ্ণ ভঙ্গ কৃষ্ণ কর কৃষ্ণ শিক্ষা”। দুই মাতাল নিত্যানন্দের আদেশ শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, আর নয়নে বলতে লাগল— তোর নাম কি? নিত্যানন্দ প্রভু জবাব দিলেন নাম অবধৃত, জগাই মাধাই বলল – তুই কি বলছিস্? নিত্যানন্দ আমি হরি নাম করতে বলছি। সেকথা শুনে মাধাই ক্ষিপ্ত ভাবে বলল শালা, আমাদের প্রতি আবার উপদেশ; বলে ভাঙ্গা হাঁড়ির টুকরা ছুড়ে মারল নিত্যানন্দের মাথায়। হাঁড়ি টুকরার আগাতে মাথা দিয়ে দর দর করে রক্ত পড়তে লাগল, তথাপি নিত্যানন্দ প্রভু অনুনয় করে বলতে লাগলেন, আমায় মেরেছিস্ ত ভালই হয়েছে তোরা একবার হরি হরি বল। হরি হরি বল। মাধাই পুনঃ মারতে উদ্যত হল, তখন জগাই মাধায়ের দুখানি হাত চেপে ধরল, বলল ভাই! বিদেশী সন্ন্যাসী মেরে লাভ নেই। এদিকে ভক্তগণ মহাপ্রভুর কাছে এ সংবাদ জানালেন। প্রভু তংশ্রবণ মাত্রই ভক্তগণসহ তথায় উপস্থিত হলেন এবং নিত্যানন্দের ললাটে রক্তের ধারা দেখে ক্রোধাবিষ্ট হয়ে সুদর্শন চক্রকে আহ্বান করলেন। মহা তেজময় সুদর্শন তৎক্ষণাৎ তথায় উপস্থিত হলেন। দুই পাপী তা দেখে ভয়ে কম্পমান। নিত্যানন্দ প্রভু অমনি প্রভুর করপদ্ম ধরে বলতে লাগলেন— হে দয়াময় প্রভো ! ক্রোধ সম্বরণ কর, এ অবতার অস্ত্র ধারণের অবতার নহে, নাম প্রেমে পাপী উদ্ধারের অবতার। আমি অনুনয় করছি তুমি অস্ত্র ধর না, নাম প্রেমে দুই পাপীকে উদ্ধার কর। নিত্যানন্দের এরূপ মহাদয়ালুতার কথা শ্রবণে শ্রীগৌরসুন্দর দ্রবীভূত হলেন। সুদর্শনকে চলে যেতে বললেন। তারপর তিনি যখন শুনলেন মাধাই নিত্যানন্দকে মারতে জগাই তাকে রক্ষা করেছে, তখন করুণাময় প্রভু জগাইকে ডেকে বললেন, জগাই ! তুই আমার দিব্য রূপ দর্শন কর এ বলে প্রভু তাকে দিব্য চতুর্ভূজ নারায়ণ স্বরূপ দর্শন করালেন। জগাই সে দিব্য রূপ দর্শন করে প্রভুর চরণ তলে লুটিয়ে পড়ল এবং স্তুতি করতে লাগল। কিন্তু মাধাই কিছুই দেখতে পেল না। জগাই বলল আমরা দুই ভাই, আমাকে যেমন দয়া করলে তেমনি মাধাইকে কর। প্রভু বললেন নিত্যানন্দ আমার প্রাণ, যে নিত্যানন্দকে দ্রোহ করে আমি তাকে কৃপা করি না। মাধাই যদি নিতাইর চরণ ধরে অপরাধ ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে সেও প্রেম পাবে। তখন মাধাই নিত্যানন্দের শ্রীচরণ তলে লুটিয়ে পড়লেন, নিত্যানন্দ তাকে বক্ষে তুলে আলিঙ্গন করলেন, তখন ভক্তগণ চারিদিকে মহা হরিধ্বনিতে মুখরিত করতে লাগলেন। এরূপ পতিতপাকা নিত্যানন্দ জগাই মাধাই দুই মহাপাপীকে উদ্ধার করে পতিত পাবন নামের সার্থকতা করলেন।
 
যখন মহাপ্রভু নদীয়া নগরে যুগধর্ম নাম সংকীর্ত্তন প্রচার করছিলেন, তপন নদীয়ার শাসক সিরাজউদ্দীন মৌলানা ভীষণ বাধা প্রদান করল, ভক্তদের গৃহে প্রবেশ করে মৃদঙ্গ প্রভৃতি ভেঙ্গে দিতে লাগল। সমস্ত কথা ভক্তগণ প্রভুর কাছে নিবেদন করলেন। তা শুনে মহাপ্রভু নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে পরামর্শ করে সমস্ত ভক্তগণকে সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যায় এক বিরাট নগর সংকীর্ত্তন বাহির করলেন। শ্রীগৌর-নিত্যানন্দের অচিন্ত্য শক্তিতে কোথা হতে এত ভক্ত সমাগম হল তা কেহ বুঝিতে পারলেন না। তাদের দিব্য রূপে যেমন দশদিক আলোকিত হয়ে উঠল, ভক্তগণেরও তদ্রূপ রূপের সঞ্চার হল। মহা সংকীর্ত্তন রোল ত্রিলোক অতিক্রম করে যেন গোলোকে পৌঁছল। পরমানন্দময় শ্রীগৌর নিত্যানন্দ যেন সেই আনন্দ সিন্ধুকে উদ্বেলিত করে নদীয়া নগরীকে নিমজ্জমান করছেন! আবাল বৃদ্ধ বনিতা সেই প্রেম-বন্যায় ডুবে গেল। মহাসংকীর্ত্তনের দল ক্রমে সিরাজউদ্দীন মৌলানা কাজীর গৃহের দিকে চলতে লাগল। এবার কাজী এ সমস্ত বিভূতি দর্শন করে নিস্তব্ধ ভাবে গৃহে বসে রইল। যেন তাঁর শক্তি সংকীৰ্ত্তন অপহৃত হয়েছে।
 
অতঃপর গৌরহরি, নিত্যানন্দ ও অদ্বৈত আচার্য্য প্রভৃতিকে সঙ্গে নিয়ে কাজীর গৃহেতে প্রবেশ করলেন এবং কাজীকে আহ্বান করলেন। বললেন—আজ আপনার নগরে যে মহাসংকীর্ত্তন হচ্ছে তাতে কেন বাধা দিচ্ছেন না। কাজী উত্তর করলেন হে গৌরহরি। আমি যেই দিবস ভক্তের গৃহে প্রবেশ করে মৃদঙ্গ ভেঙ্গে ছিলাম সেই দিবসের রাত্রে এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছিলাম। কোন এক ভয়ঙ্কর নৃসিংহ মূর্ত্তি হুঙ্কার করে আমার বক্ষে আরোহণ করে বলেছিলেন এ মৃদঙ্গ খন্ডে তোর বক্ষ বিদীর্ণ করব। আমি ভয়ে অনেক স্তব করতে থাকলে, তিনি বললেন তোকে আজ ক্ষমা করে যাচ্ছি। স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল রাত্র শেষ হল, সে অবধি আমি আর সংকীর্ত্তনে বাধা দিই না। আমার মনে হয় তুমিই সেই ঈশ্বর।
 
মহাপ্রভু বললেন আমি সব দোষ ক্ষমা করব তুমি একবার হরিবোল বল, এটি যুগ ধর্ম—যুগের সকলের জন্য। কাজী সাহেব মহাপ্রভুর ও নিত্যানন্দের দর্শন স্পর্শনে ও বাণী শ্রবণে একেবারেই মুগ্ধ আত্মহারা হলেন। প্রভুর সঙ্গে হরিনাম গান করে চললেন। কাজীর উদ্ধার দর্শনে আনন্দে ভক্তগণ হরিধ্বনি করতে লাগলেন। কাজী মহাপ্রভুর একজন পরম ভক্ত হলেন। পরবর্তী কালে তিনি চঁাদ কাজী নামে খ্যাত হলেন।
 
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু মহাপ্রভুর যাবতীয় লীলার সহায়ক। প্রভু যখন সমগ্র জীব জগতের উদ্ধারের জন্য সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন নিত্যানন্দ প্রভু তাঁর সঙ্গী হলেন। প্রভুর সঙ্গে শ্রীক্ষেত্র ধামে যাত্রা করলেন। শ্রীক্ষেত্র ধামে কিছুদিন মহাপ্রভুর সঙ্গে নিত্যানন্দ রইলেন এবং রথ যাত্রাদি দর্শন করলেন। তখন একদিন শ্রীগৌরসুন্দর নিভৃতে নিত্যানন্দ প্রভুকে ডেকে বলতে লাগলেন আমরা দুইজন যদি পুরীতে অবস্থান করি তা হলে গৌড় দেশবাসী ভক্তগণের গতি কি হবে? অতএব আপনি শীঘ্র গৌড়দেশে যাত্রা করুন, তথাকার ভক্তগণকে সুখী করুন৷ পাপী তাপী জীবগণকে উদ্ধার করুন।
 
আজ্ঞা পাই’ নিত্যানন্দচন্দ্ৰ ততক্ষণে।
চলিলেন গৌড় দেশে লই’ নিজগণে।।
 
 
(চৈঃ ভাঃ অস্ত্যঃ ৫|২৩০)
 
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু রাম দাস, শ্রীগদাধর দাস, শ্রীরঘুনাথ বৈদ্য, শ্ৰীকৃষ্ণদাস পণ্ডিত, শ্রীপরমেশ্বরী দাস ও শ্রীপুরন্দর পণ্ডিতকে সঙ্গে নিয়ে গৌড় দেশাভিমুখে যাত্রা করলেন।
 
প্রথমে পাণিহাটী গ্রামে শ্রীরাঘব পণ্ডিতের গৃহে আগমন করলেন। ক্রমে গৌড় দেশবাসী ভক্তগণ তথায় আগমন করলেন। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু প্রতিদিন সংকীৰ্ত্তন মহোৎসব করতে লাগলেন। একদিন রাঘব পণ্ডিতকে বললেন আজ কদম্ব ফুলের মালা পরিধান করব। ভক্তগণ বললেন হে প্রভো এখন ত কদম্ব ফুলের সময় নয়, কোথায় পাব? নিত্যানন্দ প্রভু বললেন— দেখ বাগানে আছে। ভক্তগণ বাগিচায় এলেন দেখলেন জম্বীরের গাছে কদম্ব ফুল সকল ফুটে আছে।
 
জম্বীরের বৃক্ষে সব কদম্বের ফুল।
ফুটিয়া আছয়ে অতি-পরম-অতুল।।
 
–(চৈঃ ভাঃ অন্ত্যঃ ৫।২৮২)
 
এক সময় নিত্যানন্দ প্রভুর অলঙ্কার পরিধান করতে ইচ্ছা হল। তৎক্ষণাং অলঙ্কার সকল উপস্থিত হল।
 
তবে নিত্যানন্দ প্রভুবর কত দিনে।
অলঙ্কার পরিতে হইল ইচ্ছা মনে।।
ইচ্ছামাত্র সর্ব্ব-অলঙ্কার সেই ক্ষণে।
উপসন্ন আসিয়া হৈল বিদ্যমানে।।
 
–(চৈঃ ভাঃ অন্ত্যঃ ৫।৩৩৩-৩৩৪)
 
পাণিহাটী গ্রাম হতে কিছুদিন পরে নিত্যানন্দ প্রভু খড়দহ গ্রামে পুরন্দর পণ্ডিতের গৃহে আগমন করলেন। প্রভুর নিজজনগণও ক্রমে তথায় উপস্থিত হলেন, তথায় কিছুদিন কীর্ত্তন বিলাস করবার পর গঙ্গাতটে সপ্ত গ্রামে বণিক শ্রেষ্ঠ শ্রীউদ্ধারণ দত্তের গৃহে শুভ বিজয় করলেন।
 
বণিক তারিতে নিত্যানন্দ অবতার।
বণিকেরে দিলা প্রেমভক্তি অধিকার।।
 
–(চৈঃ ভাঃ অন্ত্যঃ ৫।৪৫৪)
 
শ্রীনিত্যানন্দ কিছুদিন বণিক কুলকে উদ্ধার করে শ্রীশান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈত আচার্য্য ভবনে আগমন করলেন।
 
দেখিয়া অদ্বৈত নিত্যানন্দের শ্রীমুখ।
হেন নাহি জানেন জন্মিল কোন্‌ সুখ।।
 
–(চৈঃ ভাঃ অন্ত্যঃ ৫।৪৭০)
 
 
 
কয়েক দিন শ্রীনিত্যানন্দ শান্তিপুরে অবস্থানের পর শ্রীনবদ্বীপ মায়াপুরে শ্রীশচীমাতাকে দর্শনের জন্য আগমন করলেন।
 
তবে অদ্বৈতের স্থানে লই’ অনুমতি।
নিত্যানন্দ আইলেন নবদ্বীপ-প্ৰতি।।
সেই মতে সৰ্ব্বাদ্যে আইলা আই-স্থানে।
আসি নমস্করিলেন আইর চরণে।।
নিত্যানন্দ স্বরূপেরে দেখি শচী আই৷
কি আনন্দ পাইলেন—তা’র অন্ত নাই।।
 
― (চৈঃ ভাঃ অন্ত্যঃ ৫|৪৯৬-৪৯৮)
 
কিছুদিন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু নবদ্বীপ পুরে অবস্থান করে মহা সংকীর্ত্তন বিলাস করতে লাগলেন।
 
একসময় চোর দস্যু দলপতি এক ব্রাহ্মণ কুমার নিত্যানন্দের অঙ্গে বিবিধ অলঙ্কার দেখে তা হরণ করবার জন্য মনস্থ করল এবং সঙ্গী চোর দ্যুগণকে আহ্বান করল। চোরগণ প্রথম দিনের রজনীতে এসে দেখল নিত্যানন্দের চতুষ্পার্শে বহু ভক্তগণ বসে সংকীর্ত্তন করছেন। দ্বিতীয় দিন পুনঃ এল, নিত্যানন্দের পার্শ্বে কাকেও না দেখে দস্যুগণ অস্ত্র নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করল, যখনই প্রবিষ্ট হল তখনই সকলে অন্ধ হয়ে গেল আর ভয়ঙ্কর ঝড় বর্ষা আরম্ভ হল, দস্যুগণ আর কোথায় যাবে সবে অন্ধ হয়ে গড় খাইয়ের মধ্যে পড়ে মহা কষ্ট দুঃখ ভোগ করতে লাগল। সারারাত্রি এরূপে কেটে গেল, প্রাতঃকাল হল, ঝড় বর্ষা থেমে গেল। তখন দস্যুগণ বুঝতে পারল এ সব নিত্যানন্দ প্রভুর প্রভাব, সকলে শ্রীনিত্যানন্দ চরণে এসে স্তব করতে লাগল—
 
রক্ষ রক্ষ নিত্যানন্দ শ্রীবাল গোপাল।
রক্ষা কর’ প্রভু, তুমি সৰ্ব্ব জীব-পাল।।
 
তুমি সে জীবের ক্ষম সর্ব অপরাধ।
পতিতজনেরো তুমি করহ প্রসাদ।।
 
– (চৈঃ ভাঃ অস্ত্যঃ ৫।৬২৬-৬২৯)
 
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এভাবে দীনহীন পাপী সকলকেই প্রেম ভক্তি দান করেন।
 
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু যখন পাণিহাটি গ্রামে শ্রীরাঘব পণ্ডিত গৃহে অবস্থান করছিলেন সেই সময় শ্রীহিরণ্য গোবর্দ্ধন দাসের পুত্র শ্রীরঘুনাথ দাস শ্রীনিত্যানন্দ চরণে শরণাপন্ন হন।
 
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু রঘুনাথ দাসকে নিকটে টেনে এনে স্বীয় কোটি চন্দ্র সুশীতল শ্রীচরণ তাঁর মস্তকে ধারণ করেন এবং বলেন তুমি আমার ভক্তগণকে চিড়াদধি ভোজন করাও। নিত্যানন্দ প্রভুর নির্দেশে শ্রীরঘুনাথ দাস চিড়াদধি মহোৎসব অনুষ্ঠান করলেন। অদ্যাপি চিড়াদধি মহোৎসব পাণিহাটীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনস্তর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কৃপায় শ্রীরঘুনাথ দাসের সংসার বন্ধন থেকে উদ্ধার লাভ এবং শ্রীগৌরসুন্দরের শ্রীপাদপদ্ম লাভ হয়।
 
 
 
শ্রীচৈতন্য লীলার ব্যাস বৃন্দাবন দাস ঠাকুর বলেছেন—
 
নিত্যানন্দ-প্রসাদে সে সকল সংসার।
অদ্যাপিহ গায় শ্রীচৈতন্য-অবতার।।
 
–(চৈঃ ভাঃ অস্ত্যঃ ৫। ২২০ )
 
শ্রীল কবিরাজ গোস্বামী প্রভু বলেছেন—
 
শ্রীচৈতন্য—সেই কৃষ্ণ, নিত্যানন্দ রাম।
নিত্যানন্দ পুর্ণ করে চৈতন্যের কাম।।
নিত্যানন্দ-মহিমা-সিন্ধু অনন্ত অপার।
এক কণা স্পর্শি মাত্র,—সে কৃপা তঁাহার।।
 
–(চৈঃ চঃ আঃ ৫।১৫৬-১৫৭)
 
 
শ্রীল নরোত্তম ঠাকুর মহাশয় গেয়েছেন —
 
 
নিতাই পদকমল,
কোটি চন্দ্র সুশীতল,
যে ছায়ায় জগৎ জুড়ায় ।
হেন নিতাই বিনে ভাই,
রাধাকৃষ্ণ পাইতে নাই,
দৃঢ় করি ধর নিতাই পায়।।
সে সম্বন্ধ নাহি যার
বৃথা জন্ম গেল তার,
সেই পশু বড় দুরাচার।
নিতাই না বলিল মুখে
মজিল সংসার-সুখে,
বিদ্যা-কুলে কি করিবে তার।।
অহঙ্কারে মত্ত হঞা
নিতাই-পদ পাসরিয়া,
অসত্যেরে সত্য করি মানি।
নিতাইর করুণা হবে,
ব্রজে রাধাকৃষ্ণ পাবে,
ধর নিতাই চরণ দু’খানি।।
নিতাই-চরণ সত্য
 
 
তাহার সেবক নিত্য,
 
 
নিতাই-পদ সদা কর আশ।
নরোত্তম বড় দুঃখী
নিতাই মোরে কর সুখী,
রাখ রাঙ্গাচরণের পাশ।।
 
 
—( প্রাচীন মহাজন কীৰ্ত্তনাবলী )
 
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর পার্ষদ যাঁরা ব্রজের সখা বলে উক্ত হয়েছেন তাঁরাই দ্বাদশ গোপাল নামে খ্যাত।
 
১। শ্রীঅভিরাম ঠাকুর শ্রীপাট খানাকুল কৃষ্ণনগর।
২। শ্রীসুন্দরানন্দ ঠাকুর শ্রীপাট যশোহর জেলার অন্তর্গত মহেশপুর।
৩। শ্রীকমলাকর পিপ্পলাই শ্রীপাট মাহেশ।
৪। শ্রীগৌরীদাস পণ্ডিত শ্রীপাট অম্বিকা কালনা।
৫। শ্রীপরমেশ্বরী দাস শ্রীপাট আটপুর।
৬। শ্রীধনঞ্জয় পণ্ডিত শ্রীপাট পাল পাড়া, চাকদহ।
৭। শ্রীমহেশ পণ্ডিত শ্রীপাট কাটোয়ার নিকট শীতল গ্রাম।
৮। শ্রীপুরুষোত্তম পণ্ডিত, শ্রীপাট সুখসাগর।
৯। শ্রীকালা কৃষ্ণ দাস শ্রীপাট আকাই হাট গ্রাম।
১০। শ্রীপুরুষোত্তম শ্রীপাট চঁান্দুড় গ্রাম।
১১। শ্রীউদ্ধারণ ঠাকুর শ্রীপাট সপ্ত গ্রাম।
১২। শ্রীধর শ্রীপাট (অজ্ঞাত)
 
শ্রীচৈতন্য লীলার ব্যাস শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর শেষ ভৃত্য বলে পরিচিত। এ পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভাবে নিত্যানন্দ চরিত সমাপ্ত হল।
 
জয় পতিত পাবন দয়াল ঠাকুর সপার্ষদ শ্রীশ্রীল নিত্যানন্দ প্রভু কি জয় ৷
 
 

Date

Feb 14 2022
Expired!

Time

All Day
Category